কবরস্থানরায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবি কবরস্থান

খুব অল্প সংখ্যক সিনিয়র সিটিজেন আমাকে উপদেশ দেন যে, সময় পেলে সরকারি অফিস, আদালত, সরকারি হাসপাতাল আর কবরস্থান ঘুরে আসবি। যেহেতু সিনিয়র সিটিজেন তাই আমি খুব আস্তে করে করে কবরস্থানে ঘুরে আসাটা সম্পর্কে তাদের জিজ্ঞাসা করতাম। অনেকে অনেক অর্থপূর্ন কথা বলতেন তাতে একটি লাইন থাকত সব সময় তা হল, “আমাদের শেষ গন্তব্য কবরস্থান, সেখানে গিয়ে দেখো তোমার থেকে ধনবান, ক্ষমতাধর, শক্তিশালী সবাই চুপ, তুমি ওখানে গিয়ে চুপ হয়ে যাবে, শুধু নেম প্লেট দেখতে পাবে, অনেক পরিচিত নাম দেখতে পাবে, আমার নাম এমনকি তোমার নামও দেখতে পাবে.. (ছোট একটি হাসি)”

আমি সময় নিয়ে কখনই কোন সিনিয়র সিটিজেনের কথা আমলে নিয়ে উক্ত স্থানসমূহে ঘুরতে বা দেখতে যাই নাই। তবে যখনি কোন কাজে বা প্রয়োজনে গিয়েছি সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত সময় সেখানে থেকেছি ঘুরে ঘুরে দেখেছি।

আজ ১২ নয় দুই হাজার ২৫ তারিখ। গতকাল একটি গ্রুপ ম্যাসেজে একই ম্যাসেজ রিপ্লাই হিসেবে বারবার আসছিল। অনেকেই অসুস্থ কয়েকজনের নাম মনে আসল কাপা-কাপা হাতে টাচ্‌ করতেই তৃতীয় আরেক জনের নাম দেখলাম, পড়লাম। এই জানাজায় অংশ নেয়া যাবে কারণ বেশি দূরে না, রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবি কবরস্থানে দাফন হবে। জানাজা ভিন্ন একটি স্থানে তবে সেখানেও যাওয়া যাবে। অংশ নিলাম, জানাজা শেষ করেই রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবি কবরস্থানে চলে আসলাম। এখানে ব্লক, লেন এবং কবরের সিরিয়াল নাম্বার দিয়ে ইনডেক্স করা থাকে। আগে একবার গিয়েছিলাম তবে তখন এটা খেয়াল করি নাই।

কবর এর কাছে আসার আগেই কিছু লোক চলে আসছিল, এটা দেখে এক মূহুর্তের জন্য ভুল বুঝলাম পরে নিজেকে বুঝালাম যে এত তাড়াতারি কবর দেয়া সম্ভব না, এখানে প্রতিদিন অনেকেই আসে চলে যাবার জন্য এরা অন্য আরেকটা গ্রুপ। আমি দ্রুতই খুজে পেয়েছিলাম তাদের, কারণ মেইন গেইট দিয়ে প্রবেশের সময় কর্তব্যরত একজন আনসারকের জিজ্ঞাসা করে দিক নির্দেশনা নিয়েছিলাম।

কবর তৈরী, পৌছানের কয়েক মিনিটের মাঝেই লাশবাহি ফ্রিজিং গাড়িটি খোলা হল এবং দ্রুত কবরে নামানো হল। বিভিন্ন স্থানে কবর দেবার পদ্ধতি ভিন্ন-ভিন্ন হয়। এখানে মাটি দূর্বল তাই পশ্চিম দিকে চাপিয়ে বাঁশ ও বাঁশের চাটি দিয়ে কাত করে মাটি দেয়া হয়।
 এখন বাসায় ফেরার পালা, দাফন কাজ শেষ করে পিছনে ফিরে দেখলাম বড় একটি এরিয়া ঘেরাও করা এবং কিছু লেখা, দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল না  তাই এগিয়ে আসলাম “জুলাই গণ-অভ্যুস্থান ২০২৪ শহীদদের গণকবর” দেখে কিছুক্ষনের জন্য সব কিছু ভাবনার বাহিরে চলে আসলাম। মনে হল আর কিছুর দরকার নাই, এখানে দাড়িয়ে বাকি সময় শেষ করা যাবে। আমি হাটছিলাম দেখতেছিলাম কোন নাম পাওয়া যায় কি/না, নেম প্লেট নাই, কবর আছে এতটুকু বুঝতে পারবে যে কেউ, মাঝে একটা নেম প্লেট আছে শুধু একটাই, পড়ছি আর এরিয়ার শেষ দিকে আগাচ্ছি। মনে হল অনেক লম্বা একটা পথ পাড় হচ্ছি, পথ শেষ হচ্ছে না, পথ শেষ হল।

কোন ব্লকে ছিলাম সেটা দেখলাম না কারন সমানে যে ব্লকটা ছিল তার শিরোনাম ছিল এমন “শিশুদের … ব্লক ৬” কেমন যেন আবছা দেখছি সবকিছু। পিছু চলে আসতে চাচ্ছি কিন্তু পিছনে শহীদের কবর আবার দেখতে হবে, আরো অনেক কিছু ভাবনায় আসলেও তা আসতে চাচ্ছে না এবং আমি ধিরে ধিরে ব্লক ৬ এর ভিতরে হাটছি। একেকটা নেম-প্লেট শিশুদের নাম, বয়স, কারো একই দিন, কারে.., হিসেব বাদ, শুধু নাম দেখছি। নেম প্লেট ছাড়াও আরো কিছু লেখা আছে শুধু পড়ছি, হয়তো সিনিয়র সিটিজেন এর জন্যই কবরস্থানে ঘুরে আসতে বলতো। একটা নেম প্লেট যেখানে হয়তো অভিভাবক বড় কোন কবিতা বা উপন্যস লিখতে চেয়েছিলেন, স্থানের সংকুলান হবে না, তাই লিখেছিলেন

চোখে পানি আসাটা আমার কাছে খুব অস্বাভাবিক ব্যাপার, তবুও চারপাশ ঝাপশা হয়ে আসছে, ডুকরে ডুকরে কাঁদতে পারব, কেউ দেখার নাই এখানে..। শেষ চোখে পানি আসছিল যখন আব্বুর কবর শেষে মোনাজান শেষ হয়েছিল, বাঁধ ভাঙ্গা সেই কান্না, শেষ হচ্ছিল না। আমিও শেষ করতে চাচ্ছিলাম না, তবে শেষ করতে হয়েছে কারণ এতিমের সম্পদ বাটোয়ারা করতে সবাই বসে আছে, আমি কান্না বন্ধ না করলে সব নিয়ে যাবে। প্রতিটি অপ্রয়োজনীয় কাজের বিরুদ্ধে না এবং খরচের তালিকা ছোট করতে মাথাটাকে শোকের বদলে হিসেবের দিকে খাটাতে হচ্ছিল।

শিশুদের ব্লক৬ মনে হয় অনেক বিশাল এরিয়া নিয়ে, শেষ হয়নি তখনো যখন আমি হাটতে হাটতে লেকের পারে চলে আসি। লেক আর লেকের পানি দেখে মনে হল কোন গহিন বনে চলে আসছি। একটু ভয় করছিল তাই মাথাকে বুঝালাম গহিন বনে ফুটপাত থাকে নাকি! লেকের পাড়ে বসতে চেয়েছিলাম, সবুজ শেওলা বিছানো লেক পাড়। বসলে মন জুড়িয়ে যেত কিন্তু আমি আরো দেখতে চাচ্ছি তাই হাটতেছি।

কিছু দূরেই এই দুপুর বেলা একজন ওয়াটার পট হাতে এখানে ব্যায়াম করছে। তাকে পাশকাটানোর পর মোটসাইকেলে করে দু’জন নর-নারী কথা বলতে বলতে কবরস্থান ঘুরে দেখতে দেখলাম। কাছেই একটি সুদর্শন ব্রিজ। গ্রামের বাড়িতে বসে সময় কাটানোর জন্য ব্রিজ ছিল আমার একমাত্র ভরশা। শহরে যে কত শত মডেলের ব্রিজ তৈরী হয়, এটার সৌন্দর্য অনেক, সেখানে দু’কপত-কপতি হাতে-হাত ধরে বসে আছে। শহরে এগুলো কোন ব্যাপার না তবুও তারা আমাকে দেখে হচকচিয়ে গেল এবং হাত ছেড়ে দাড়ালো। দেখে না দেখার ভান করে চলে আসলাম এখানে এত বেশি গাছ বা লতাপাতা নাই। ভিতরে আরো অনেক লতাপাতা আর গাছ, ভরা দুপুর বেলাতেও সকাল বা বিকাল মনে হয়। কোন পূর্ব পরিকল্পনা আর ম্যাপ জানা না থাকায় এক দিক লক্ষ্য করে হাটতে হাটতে কোন এক সীমানা প্রাচীরে পৌছালাম। সীমানা প্রাচীর ভাঙ্গা মানে সীমানা দেয়া দেয়াল ভাঙ্গা। ভাঙ্গা দেয়াল দিয়ে কবরস্থানে ঢোকা এবং বের হওয়ার জন্য ইট দেয়া, কারা এই পথ দিয়ে কবরস্থানে যাওয়া আসা করে?!

খেলার জন্য কোন সুনির্দিষ্ট উপাদান প্রয়োজন হয় না, খেলতে ই্চ্ছা করলে যে কোন কিছু দিয়ে কোন নিয়ম তৈরী করে খেলা যায়। তবে খেলার জন্য আবশ্যিকভাবে যেটা প্রয়োজন সেটা হলো ওপেন স্পেস। স্টেডিয়াম ওপেন স্পেস, ইনডোর স্টেডিয়ামও আছে, বড় বড় দালানের ভিতরেও অনেক সময় বড় বড় ইনডোর স্টেডিয়াম থাকে। এই কবরস্থান অনেক বড় হওয়ায় এখানেও অনেক খালি জায়গা আছে সেখানে ছেলেরা খেলাধুলা করে।

আমি চাই এমন সুন্দর সাজানো গোছানো কবস্থান প্রতিটি জেলায় একটি করে হোক। এত বড় না হোক অন্তত্য সুন্দর যেন হয়। যেখানে সেখানে আমার কবর না হয়ে এমন একটি সুন্দর জায়গায় যেন আমার কবর হয়।

আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *