খুব দ্রুতই জাতীয় পরিচয় পত্রের ভুল সংশোধন করা যেত। মানে সামান্য ভুল থাকলে নির্দিষ্ট ফরমের মাধ্যমে আবেদন করলেই একদিনেই তা সংশোধন করে প্রিন্ট করে দিত নির্বাচন কমিশন। পরে আস্তে আস্তে সেখানে চার্জ ধার্য করা হয়। অন্যান্য সরকারী সেবায় চার্জ থাকলে এখানে হবে না কেন। তাই এখানেও চার্জ হওয়াতে ভালো হয়েছে, লোকজন সব দেখেশুনে বুঝে কাজ করবে, কারণ ভুল হলেই চার্জ গুনতে হবে।
আমরা যারা ভুল সংশোধন করতাম তারা মূল নথি হাতে করে নিতাম, প্রয়োজনে ছায়ালিপি এবং তা সত্যায়িত করে নিতাম, লাইনে দাড়িয়ে অনেকক্ষণ পর কর্মকর্তাদের দেখা পাবার পর তারা তা এপ্রুভ করে দিত। মোটামুটি একদিন কষ্ট করলে আইডি কার্ড হতে পাওয়া যেত। তবে যারা ঢাকার বাহিরে থাকতো তারা কষ্ট করে এসে হাসি মুখে ফিরে যেত। এখানে কোন কাগজ পত্রে ভুল থাকলে কর্মকর্তারা একটু কটু কথা বলে অন্যান্য নথি আনতে বলতো তা না হয় ফটোকপিতেও কাজ করে দিত, কোন ভুল থাকলে তা জানাতো।
সবার কষ্ট দেখে প্রতি থানায়/উপজেলায় নির্বচন কমিশন বসানো হল। তাতে করে সবাইকে আর ঢাকা মুখি হতে হল না। মানে থানা থেকেই অনলাইনে আবেদন করতে পারবে যা ঢাকায় থাকা (কর্তৃপক্ষ) তা অনুমোদন করে দিত।  

মানে সেই আগের সিস্টেম আপনি ফাইল দিলেন আর সরকারী কর্মকর্তারা তা খুলতেই ভুলে গেল। আর দেখলো সেখানে কিছু ভুল তা আপনাকে জানানোর কি দরকার, ফাইল না দেখলেও তো বেতন আসবে। তাই অনলাইনে আবেদন করার দুই সপ্তাহ পর আপনি জানতে পারবেন আপনার আবেদনের কি হাল। অবশ্য আবেদনের সঙ্গে সঙ্গে আপনি ম্যাসেজ পাবেন, সে রেজিস্টেশন নাম্বার দিয়ে আপনি 105 এ কল দিয়ে বিস্তারিত জানতে পারবেন আপনার আবেদনের কতটা অগ্রগতি হয়েছে। তারা শুধু বলতে পারবে আপডেট কি হাল।

তো এখন আমার অভিজ্ঞতা কিছু বলি।
আবেদনের ২ সপ্তাহ পর 105 এ কল দিলাম, ম্যাসেজ আসেনি কেন জানতে চাইলে বলে, উপজেলা থেকে কোন আবেদন আসেনি!!
আবার উপজেলা গেলাম, তারা বলে টাকার হিসেবটা ভুল, আমি এর আগে সংশোধন করিয়েছিলাম তাই এবার ভিন্ন ফি দিতে হবে। তারা ঠিক করে দিল, তাদের কাছে আমার মোবাইল নাম্বার ছিল সেদিনই জানাতে পারত। আর আমার ভুল আমি কেন জানিনা।
আবার টাকা জমা দিয়ে আবেদন, সঙ্গে সঙ্গে ম্যাসেজ। ২ সপ্তাহ পর আবার 105 এ কল। আমার আবেদন প্রসেস আছে। হয়ে যাবে।
আবার ২ সপ্তাহ পর কল একই কথা
আবার ২ সপ্তাহ পর কল দিয়ে একই কথা শোনার পর বসে না থেকে চলে আসলাম থানা অফিসে, তারা আমাকে 105 এ কল দিতে বলে। তাই চলে আসলাম সেদিনই আগারগাঁয়, দাড়ালাম তথ্য কেন্দ্রে। সেখানে জানলাম আরো কিছু ডকুমেন্ট দিতে হবে তাদের। সেখান থেকে বের হয়ে আবার 105 আর প্রকৃয়াধীন আছে এমন কথা শুনে মাথা নষ্ট
চলে আসলাম থানার অফিসে। তাদের বললাম, হেড অফিস কি আরো নথি চেয়েছে। তারা বলে 105 এ কল দিন।

তথ্য অফিসার একটি পাতায় নথির কথা লিখে দিয়েছিলেন, সেটা দেখালাম সে কম্পিউটারে ঢু মেরে দেখলো এবং তথ্য অফিসার যা বলল তা আবার বলতে শুরু করলে রুচি নষ্ট হবার ভয়ে বের হয়ে চলে আসলাম আর নথি জোগার করতে শুরু করে পরের দিন আবার থানা নির্বাচন কমিশনে।
সাবমিট করে 105 এ কল। কিছুক্ষণ কথা বলার পর একই কথা না জিজ্ঞাসা করে বললাম আজ যে যে নথি দিয়েছি তা পৌছিয়েছে কি/না। তারা প্রাপ্তি স্বীকার করল।
আবার 2 সপ্তাহ পরে কল, জিজ্ঞাসা করলে জানায় উপজেলা নির্বাচন কমিশনার সারজমিনে তদন্ত করে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। জানতে চাইলাম “তিনি কি আমাদের বাড়িতে আসবেন?” তারা জানালো যে প্রয়োজন হলে আসতে পারে বা তার প্রতিনিধি আসবে। কল দিয়ে আবার জানতে চাইলাম “এ তদন্ত রিপোর্ট  আমাকে কবে সাবমিট করতে বলা হয়েছে?” তারা জানায় যে এটা নাগরিক নয় কমিশনারের কাজ তার কাছে ম্যাসেজ যায়।

উপজেলা নির্বাচন কমিশনার ব্যাস্ত থাকতে পারে তাই নিজেই গেলাম তার কার্যালয়ে গিয়ে তার সহযোগীর সাথে কথা বলে তাদের ওয়াকিবহাল করলাম তারা দেখলো এবং আমার সামনেই পাঠালো। (যাক তারা খুব ব্যাস্ত থাকে না বললে হয়ত তদন্ত হতই না!!!)
তদন্ত রিপোর্ট পাঠানোর ৩ সপ্তাহ পর 105 এ কল দিলে প্রকৃয়াধিন আছে জানালে মেজাজ.. আর কত!! আবার গেলাম আগারগাঁয়। তথ্য অফিসার থেকে জানতে পারলাম এটা নাকি হবার কথা কিন্তু কেন হচ্ছে না সে কিছুটা অবাক। তাই তিনি হেড অফিসের একজন দ্বায়ীত্বরত কর্মকর্তা জুবায়ের স্যার (কাল্পনিক নাম) এর সাথে কথা বলতে বললেন। আমি সিরিয়াল দিয়ে কথা বলার পর তিনি আশ্চর্য হলেন এবং প্রাপ্তিস্বীকার রশিদে একটা স্বাক্ষর করে একজন কম্পিউটার পরিচালকের সাথে কথা বলতে বললেন। আসলাম তার কাছে তিনি নেই, তবে কিছুক্ষণ পরে আসলেন আর জুবায়ের স্যারও দেখলাম আমার কাছে এসে বলে আপনি দাড়িয়ে আছেন এখনো!! আপনার কাজ হয়নি?
ম্যাম এসে বসতেও পারেনি আর স্যার দেখলো ম্যাম মাত্র আসলো,  স্যার কিছু না বলেই চলে গেলেন আর ম্যাম বললো আমার আবেদন দেখার জন্য, একটার পর একটা নথি নিরিক্ষা করার পর একটা নথি তিনি বুঝতে পারলেন না, কারণ অনেকদিন আগের এবং বেশ ঘোলা। আমি দেখিয়ে দিলাম, তবুও হবে না নতুন করে সে নথিটা তাকে দিতে হবে প্রিন্ট কপি।

পরের দিন দিলাম তাকে প্রিন্ট কপি, তিনি জানালেন এটা চুড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য তিনি আপলোড করে দিবেন। তবে ২ সপ্তাহ পরে 105 এ কল দিয়ে জেনে নিতে বললেন। গেল দুই সপ্তাহ, আবার কল এবার ভিন্ন কথা এটা যে উদ্ধতন কর্মকর্তার কাছে গিয়েছে তা জানালো, তবে তা কতদিনে তার কাছ থেকে রেহাই পাবে তা জানাতে পারলেন না, তবে ম্যাসেজ যে আসবে তা জানালো, যদি ম্যাসেজের কথা আগে অনেকের কাছে শুনেছি।
তো আর না পেরে আবার হেড অফিস, সেখানে তথ্য কর্মকর্তার বেশ মায়া হল আমাকে দেখে। এবং বললো আরও দু’সপ্তাহ্‌ অপেক্ষা করেন পাবেন।
তার সহানুভুতিতে চলে আসলাম, আর তার ৪র্থ দিন ম্যাসেজ আসলো যে আমার আইডি কার্ড সংশোধন হয়েছে এবং প্রিন্টও হয়েছে।
আমি 105 কল দিলাম যে আমি হেড অফিস থেকে  এটা উঠাতে পারব কি না, তারা জানায় যে এটা আমাকে উপজেলা অফিস থেকেই উঠাতে হবে এবং তার জন্য আরে ১৫… জ্বী লাইন কেটে দিয়েছি। আর হেড অফিসের দিকে রওনা, সেখানের তথ্য অফিসার আবার তার সহানুভুতির চোখে আমাকে দেখলেন এবং বললেন যে জুবায়ের স্যারের সাথে কথা বলেন তিনি দিতে চাইলে পাবেন। তাকে বলার সঙ্গে সঙ্গে তার সহকারীকে দেখিয়ে দিলেন তিনি আমার আইডি কার্ড খুজে দিয়ে দিলেন।

আপনারা যা করবেন:
আবেদনের পর প্রতি সপ্তায় সপ্তায় কল দিবেন, পর পর তিন সপ্তাহ  একই কথা শুনলে চলে আসবেন হেড অফিসে,  আসলে দেখবেন কোন সমস্যা আছে কি না।
শুনেছিলাম আনসারেরা টাকার বিনিময়ে সংশোধন করে দেয়, আর তাই বাজিয়ে দেখেছিলাম, তারা জানায় আবেদন করলে তাদের হাতে নাকি কিছুই করার থাকে না, তবে আবেদন না করলে একদিনেই সব করে দিতে পারে, আর টাকাও চায় অনেক তাই নিজেকে পোড়ালাম আর আইডি আজ পেয়ে লিখতে বসলাম।

তথ্যটি শেয়ার করুন
No comments